| ২০শে জুলাই, ২০১৯ ইং | ৫ই শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৬ই জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী | শনিবার

দখল ও অবহেলায় নিশ্চিহ্নের পথে বিপ্লবী সাহিত্যিক সোমেন চন্দের স্মৃতি

লক্ষন বর্মন, নরসিংদী : নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় বালিয়া গ্রামে ভারতবর্ষের প্রথম প্রগতিশীল লেখক সোমেন চন্দের স্মৃতি বিজরিত পৈতৃক বাড়িটি দখল ও অবহেলায় নিশ্চিহ্নের পথে। নতুন প্রজন্ম ভুলতে বসেছে এই মহান ব্যক্তিকে। স্থানীয় লোকজন ভারতবর্ষের প্রথম প্রগতিশীল লেখক সোমেন চন্দের স্মৃতি সংরক্ষণে দাবী জানিয়েছেন। প্রতিভাবান কথাসাহিত্যিক সোমেন ১৯২০ সালের ২৪ মে ততকালীন ঢাকা জেলার টঙ্গি থানার আশুলিয়া গ্রামে তাঁর মাতুতালয়ে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস ছিল নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার চরসিন্দুর ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামে। তাঁর পিতার নাম নরেন্দ্র কুমার, মাতা হীরণ বালা।

১৯৩৭ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশ পায় সোমেনের প্রথম গল্প ‘শিশু তপন’। এই ১৭ বছরেই বাংলাদেশে বন্যার যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দুর্ভোগ, তা নিয়ে সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে প্রথম উপন্যাস ‘বন্যা’ লেখেন সোমেন। তিনি প্রগতি লেখক সংঘে যোগদান করেন এবং মার্ক্সবাদী রাজনীতি ও সাহিত্য আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে যান। তাঁর পিতা পুলিন দাসের আখড়ায় যোগদানের মাধ্যমে ততকালীন সময়ে বিপ্লবী রাজনৈতিক শিক্ষা লাভ করেন। তিনিই বাংলা সাহিত্যে প্রথম গণসাহিত্যের উপর কাজ করেন। ১৯৪১ সালে সোমেন প্রগতি লেখক সংঘের সম্পাদক নির্বাচিত হন। প্রচন্ড মেধাবী সোমেন চন্দের লেখা সাধারণত প্রগতি লেখক সংঘের সাপ্তাহিক বা পাক্ষিক সভা সমূহতে পাঠ করা হত। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তার লেখা উপন্যাস বন্যা। ১৯৪০ সালে তার বনস্পতি গল্পটি ক্রান্তি পত্রিকায় ছাপা হয়। তার ইঁদুর গল্পটি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়। ১৯৪২ সালের ৮ই মার্চ ঢাকার বুদ্ধিজীবি, লেখক প্রভূতি শহরে এক ফ্যাসীবাদ বিরোধী সম্মেলন আহবান করেন। সম্মেলনের দিন সকালে উদ্যোক্তাদের অন্যতম তরুণ সাহিত্যিক সোমেন আততায়ীর হাতে নিহত হন। তিনিই বাংলার ফ্যাসীবাদী বিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহীদ।’ কিন্তু বিপ্লবী সাহিত্যিক সোমেন চন্দের স্মৃতি বিজরিত বালিয়া পৈতৃক বাড়িটি দখল ও অবহেলায় নিশ্চিহ্নের পথে। বসত ভিটার একপাশে স্বজনদের উত্তরাধিকারদের বসবাসের ঘর থাকলেও অন্যপাশের প্রাচীন বাড়িটি প্রভাবশালীদের দখলে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সোমেন চন্দ হত্যা পরবর্তী সময়ে তার স্বজনদের বেশীর ভাগ ভারতে চলে যান। এর ফলে তাদের বেশীর ভাগ জমি ক এবং খ তফসিলভুক্ত হয়ে যায়। এই সুযোগে এক শ্রেণীর স্বার্থান্বেসী মহল সেই জমি জোর করে দখলে নিয়েছে। একই ভাবে প্রভাবশালীরা দখলে নিয়ে মহান এই ব্যাক্তির পৈতৃক অর্ধশতাধিক একর জমি। আর এই দখল যজ্ঞের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আক্তারুজ্জামান ভূঞা নামে এক মুক্তিযোদ্ধা। কিছু জমি সরকার বিভিন্ন ব্যক্তির নামে বন্দোবস্ত দিয়েছে। এখন তাদের উত্তরাধিকারদের কয়েকজন বাপ-দাদার ভিটায় রয়েছে। কিন্তু প্রভাবশালীদের নানামাত্রিক চাপে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন তাঁরা।
বিপ্লবী সাহিত্যিক সোমেন চন্দের ভাতিজা আশীষ কুমার বলেন, সোমেন একটি বিকাশমান বিশ্বপ্রতিভার নাম। আমাদের পরিবারের জন্য গৌরব। ইতিহাস প্রায় সময়ই প্রতিভাবানদের ধারণ করতে ব্যর্থ হয়। অনেক দূর দূরান্ত থেকে লেখক ও সাহিত্যিক ও সাংবাদিকরা ওনাকে জানতে বাড়িতে আসেন কিন্তু তেমন কোন স্মৃতিচিহ্ন দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যান।
আরেক ভাতিজা সন্দীপ কুমার বলেন, আমাদের ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও প্রতিকূল পরিবেশের জন্য সোমেন চন্দের নামে কোন কিছু করতে সম্ভব হয়নি। প্রভাবশালীরা আমাদের পারিবারিক সম্পত্তি দখল করতে করতে সর্বশেষ আমাদের বসতভিটায় আঘাত হেনেছে। সোমেন চন্দের প্রাচীন বাড়িটিও সরকার অন্যের নামে লিজ দিয়েছে। সরকার যদি এই বিপ্লবী সাহিত্যিকের সকল সম্পত্তি রক্ষা করে স্মৃতি রক্ষায় উদ্যোগী হয় তাহলে আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে সকল সহযোগীতা করা হবে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মুক্তিযোদ্ধা আক্তারুজ্জামান ভূঞা বলেন, আমাদের দখলে সোমেন চন্দের কোন জমি নেই। যা আছে তা সবই অমৃত লাল চন্দ নামে আলাদা এক অংশিদারের জমি।
পলাশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা আক্তার বলেন, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যারা যুক্ত ছিলেন তারা ছিলেন ন্যায়ের পক্ষে। এখন আমাদেরকে প্রতিনিয়ত জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে। সোমেন চন্দের আদর্শ নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারলে সকলের মধ্যে দেশাত্ববোধ সৃষ্টি হবে। শুনেছি সোমেন চন্দের পৈতৃক বাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে এবং তা লিজ দেয়া হয়েছে। আমরা চেষ্টা করবো সেই বাড়িটি সংরক্ষণ করে সোমেন চন্দের স্মৃতি রক্ষার।

সময় বাচাঁতে ঘরে বসে কেনা-কাটা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *