| ১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং | ১লা পৌষ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১৭ই রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী | রবিবার

নরসিংদীর কলম্বো লেবু রপ্তানী হচ্ছে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে

লক্ষন বর্মন, নরসিংদী: নরসিংদীর কাপড় ও সবজির খ্যাতি দেশজুড়ে। এখন কলম্বো লেবুর গুণেই দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশে পরিচিতি পেতে শুরু করেছে। বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা এখানকার কলম্বো জাতের বিশেষ সুগন্ধযুক্ত লেবু রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। কলম্বো জাতের এই লেবু যে শুধু ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানিই হচ্ছে তা নয়, সেখানে এটি ব্যাপক খ্যাতিও কুড়িয়েছে। এ লেবুটি বাণিজ্যিকভাবে শুধু নরসিংদী জেলাতেই উৎপাদন হয়। আবহাওয়া ও পরিবেশগত কারণে সারা বছর নরসিংদীতে প্রচুর লেবু চাষ হয়, কিন্তু কলম্বো জাতের লেবুটি ভিন্নরকম। এটি আকারে বড়, বেশি রসালো ও সুগন্ধিযুক্ত। এ ছাড়া এর বাকল পুরু ও ঘন সবুজ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নরসিংদী জেলার মাটি লেবু চাষের জন্য খুবই উপযোগী। নরসিংদী জেলার ছয়টি উপজেলার মধ্যে বর্তমানে চারটি উপজেলা শিবপুর, বেলাব, মনোহরদী ও রায়পুরায় ৩৬০ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে কলম্বো জাতের লেবুর আবাদ হচ্ছে। এসব উপজেলায় ছোট-বড় প্রায় ১ হাজার ৮০০ লেবুর বাগান রয়েছে। প্রায় দেড় হাজার চাষি এর সঙ্গে জড়িত। অধিদপ্তরের সহযোগিতায় স্থানীয়ভাবে চাষিরা লেবু উৎপাদন ও বিপণনব্যবস্থা নিয়ে সিআইজি নামের একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন। তাঁদের কাছ থেকে ব্যবসায়ীরা লেবু কিনে দেশের বাইরে রপ্তানি করে থাকেন।এই লেবুর আবাদ করে ভালো ফলন ও দেশ-বিদেশের বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় প্রতি বছরই লেবু চাষে আগ্রহ বাড়ছে এখানকার কৃষকদের। কৃষি বিভাগের লেবু বাগান ব্যবস্থাপনার বাইরেও কৃষকরা নিজ নিজ উদ্যোগে লেবু বাগান তৈরিতে ঝুঁকছেন।
রপ্তানিযোগ্য লেবু ও সবজি উৎপাদন কর্মসূচির আওতায় জেলার লেবু চাষি, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও লেবু রপ্তানিকারককে বিভিন্ন মেয়াদে প্রশিক্ষণ প্রদান করে কৃষি অধিদপ্তর। বিভিন্ন সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দল এসে নরসিংদীর কলম্বো জাতের লেবুর বেশ কয়েকটি বাগান পরিদর্শন করেন। পরে রোগমুক্ত ও সুস্বাদু হওয়ায় নরসিংদীর লেবু কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেন তারা। এরপর থেকে এখানকার উৎপাদিত লেবু রপ্তানি হচ্ছে বিদেশের বাজারে। দেশীয় পাইকাররা সরাসরি বাগান থেকে লেবু কিনে রপ্তানি করে থাকেন ইউরোপের দেশগুলোতে। এছাড়া পাঠানো হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশেও।
এদিকে, লাভজনক হওয়ায় কৃষি বিভাগের সহায়তায় প্রতি বছরই নতুন নতুন লেবু বাগান তৈরি করছেন জেলার কৃষকরা।
রায়পুরা উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের গকুলনগর গ্রামের লেবু চাষি বাবুল চৌধুরী বলেন, ‘প্রথমে ৬ বিঘা জমিতে লেবু চাষ শুরু করি। বিদেশের বাজারে রপ্তানি, ন্যায্য দাম ও ভালো ফলন পাওয়ায় পর্যায়ক্রমে লেবুর বাগান বৃদ্ধি করে বর্তমানে ৩৫ বিঘা জমিতে লেবু বাগান তৈরি করেছি। বিঘা প্রতি দেড়লাখ টাকা খরচ করে সাড়ে তিন লাখ টাকা আয় করতে পারছি।’
বেলাব উপজেলার আমলাব গ্রামের কলেজ শিক্ষক নূর হোসেন বলেন, ‘জেলাজুড়ে লেবু চাষের সফলতা দেখে আমিও লেবু বাগান করেছি। আমার মতো অনেকেই এখন লেবু চাষে ঝুঁকছেন। বছরজুড়ে ফলন ও ভাল দাম পাচ্ছি।’
শিবপুর উপজেলার দত্তেরগাঁও ভিটিপাড়া গ্রামের লেবু চাষি মাহবুব খন্দকার বলেন, ‘দেশের বাজারের পাশাপাশি বিদেশের বাজারেও এই লেবুর চাহিদা রয়েছে। লেবু চাষ করে উৎপাদন খরচ বাদে প্রতি বছর আমি ৭ থেকে ১০ লাখ টাকা আয় করতে পারছি।’
নরসিংদীর লেবু রপ্তানিকারক মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দল নরসিংদীর লেবু বাগান পরিদর্শন করে রোগমুক্ত লেবু উৎপাদনের কারণে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। ফলে আমরা বছরজুড়ে সরাসরি বাগান থেকে লেবু কিনে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশে রপ্তানি করছি।’
নরসিংদী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. লতাফত হোসেন বলেন, রোগমুক্ত ও রপ্তানিযোগ্য কলম্বো লেবুর উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষি বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা লেবু চাষিদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। সারা বছর ধরে ফলন ও লাভজনক ফসল হওয়ায় কৃষকরাও লেবু চাষে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
প্রতি বছর নতুন নতুন বাগান তৈরি ও পুরাতন বাগান ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও উপকরণ বিতরণ করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন মো. লতাফত হোসেন।
এই লেবুর গুণ ও সম্ভাবনা: নরসিংদী সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান মো. আবদুল কাফির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লেবুর রসে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে। এ ছাড়া অল্প পরিমাণে কোলেস্টেরল, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও ম্যাগনেশিয়াম রয়েছে। কলম্বো জাতের এই সুগন্ধ লেবু শরীর বৃদ্ধি ও গঠনে বেশ কার্যকর। এ ছাড়া খনিজ লবণের চাহিদা মিটিয়ে ঠান্ডা-সর্দিতে বেশ উপকারী। পাশাপাশি এই লেবুর বাকল হজমশক্তিতে বেশ কাজ করে।
এই লেবুর সুগন্ধযুক্ত ছাল প্রক্রিয়াজাত করে উদ্বায়ী তেল তৈরি করা যায়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইতালি, স্পেন, সিসিলি, পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর পরিমাণে এই তেল বাণিজ্যিকভাবে উৎপন্ন করা হয়। ওষুধে সুগন্ধি উপাদান হিসেবে এবং সুগন্ধি প্রসাধনী তৈরিতেও ব্যবহার করা হয় এই তেল।
এর বাজার সম্পর্কে আশাবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অ্যান্ড ফ্রুটস এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য মো. আরিফ উল্লাহ বলেন, ‘আমার মনে হয়, এটি রপ্তানি করে ভবিষ্যতে আমরা আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আনতে পারব।’

সময় বাচাঁতে ঘরে বসে কেনা-কাটা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *