জামিনে বেরিয়ে ফের জঙ্গিবাদে জড়িয়েছিল দুই নারী জঙ্গি

প্রকাশিত খবর,নরসিংদী প্রতিদিন,বুধবার,১৭ বুধবার ২০১৮:
আকলিমা রহমান ওরফে মনি, ইসতিসনা আক্তার ঐশি, ইশরাত জাহান ওরফে মৌসুমী ওরফে মৌ ও খাদিজা পারভীন ওরফে মেঘলা। ঐশি ছিল ঢাকা মেডিক্যাল থেকে এমবিবিএস পাস করা ইন্টার্ন চিকিৎসক। বাকি তিন জনই ছিল বেসরকারি মানারাত ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। ২০১৬ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট ঢাকা ও গাজীপুর থেকে তাদের গ্রেফতার করেছিল র‌্যাব। কিন্তু আট মাসের মাথায় আবারও জামিনে বেরিয়ে আসে তারা। জামিনে বেরিয়ে মনি, মৌসুমী ও মেঘলা আবারও জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েছিল। নতুন করে সংগঠিত করার চেষ্টা করছিল নব্য জেএমবিকে। বুধবার (১৭ অক্টোবর) নরসিংদীর একটি জঙ্গি আস্তানা থেকে যে দুই নারী জঙ্গি আত্মসর্পণ করেছে, তারাই হলো সেই ইশরাত জাহান ওরফে মৌসুমী ওরফে মৌ ও খাদিজা পারভীন মেঘলা।

গত সোমবার রাত থেকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত নরসিংদীর মাধবদীতে পৃথক দুটি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) ও পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের যৌথদল। মঙ্গলবার একটি আস্তানায় অভিযানের সময় একজন পুরুষ ও একজন নারী জঙ্গি নিহত হয়। নিহত নারী জঙ্গি হলো আকলিমা রহমান ওরফে মনি, সেও র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়েছিল। আর নিহত পুরুষ জঙ্গি হলো আবু আব্দুল্লাহ বাঙ্গালী। আকলিমা ও আব্দুল্লাহ সম্প্রতি বিয়ে করেছিল।

কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম অভিযান শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘আত্মসমর্পণকারী দুই নারী জঙ্গিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে মঙ্গলবার ‘অপারেশন গর্ডিয়ান নট’-এ নিহত দুই জঙ্গির নাম জানা গেছে। তারা হলো আব্দুল্লাহ আল বাঙ্গালী ও আকলিমা আক্তার মনি। তারা সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী। বাঙ্গালী নব্য জেএমবির মিডিয়া শাখার প্রধান হিসেবে কাজ করতো।’’

মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘মাধবদীর জঙ্গি আস্তানা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে দুই জনকে আত্মসমর্পণ করানো হয়েছে। যেহেতু তারা নারী সেহেতু তাদের আত্মসমর্পণের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছি। শেষপর্যন্ত আমরা সফল হয়েছি। যদিও তারা আজকে পুলিশকে লক্ষ করে বিস্ফোরণ ঘটানোর চেষ্টা করে। একটি বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। তবে এতে কেউ আহত হয়নি।’

সিটিটিসি ও র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, নব্য জেএমবির একটি নারী উইংয়ে সক্রিয় ছিল একটি গ্রুপ। ২০১৬ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট রাজধানী ঢাকা ও গাজীপুর থেকে চার নারী জঙ্গিকে গ্রেফতারের পর র‌্যাব কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, আকলিমা এই গ্রুপের প্রধান। তার হাত ধরেই মৌসুমী, ঐশি ও মেঘলা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে। ঐশি ছাড়া তারা তিনজনই মানারাত ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ছিল।

র‌্যাব সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট ওই অভিযানে চার জনকে গ্রেফতার করার পর তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও দশ জনের নাম উল্লেখ করে মিরপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। ওই দশজন হলো, সাফিয়া ওরফে সানজিদা ওরফে ঝিনুক, মাইমুনা ওরফে মাহমুদা ওরফে লায়লা, তাসনুবা ওরফে তাহিরা, সায়লা ওরফে শাহিদা, সালেহা ওরফে পুতুল, দিনাত জাহান ওরফে নওমী ওরফে বানী, তানজিলা ওরফে মুন্নী, আলিয়া ওরফে তিন্নি ওরফে তিতলী, মনিরা জাহান ওরফে মিলি ও ছাবিহা ওরফে মিতু।

ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বর্তমানে এডিশনাল এসপি হিসেবে উত্তরা এপিবিএন-এ কর্মরত শামসুল ইসলাম বলেন, ‘এজাহারে উল্লেখ করা সব নাম ছিল সাংগঠনিক। তাদের বিস্তারিত পরিচয় বের করা সম্ভব হয়নি। ওই চারজনের পর একজন পুরুষ ও নরসিংদী থেকে একজন নারী জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ওই নারী জঙ্গি ঐশির এক বান্ধবী। ওই ছয় জনকে আসামি করেই ওই বছরের অক্টোবর মাসে আদালতে অভিযোগপত্র দেন তিনি।

র‌্যাব সূত্র জানায়, চার্জশিটভুক্ত সব আসামিই পর্যায়ক্রমে আদালত থেকে জামিন নিয়ে কারামুক্ত হয়। এরমধ্যে গত বছরের ২ এপ্রিল আকলিমা আক্তার মনি ও ইশরাহ জাহান মৌসুমী ওরফে মৌ জামিন পায়। আর খাদিজা পারভিন জামিন পেয়েছিল গত বছরের ২৩ মার্চ। জামিনে বের হয়ে তারা আবারও জঙ্গিবাদে জড়ায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মাহমুদুল হাসান নামে এক জঙ্গির মাধ্যমে প্রথমে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েছিল আকলিমা আক্তার মনি। পরবর্তী সময়ে আকলিমার নেতৃত্বে একটি জঙ্গিদের একটি নারী সেল গড়ে ওঠে। ওই সেলের অন্যতম সদস্য ছিল মৌসুমী ও মেঘলা। প্রথমে তারা ‘হালাকা’ (এক জায়গায় মিলিত হয়ে জিহাদি বিষয়ে আলোচনা করা) করতো। পরবর্তী সময়ে সংগঠনের জন্য ‘ইয়ানত’ (সংগঠনের জন্য আদায়কৃত চাঁদা) সংগ্রহ করতো।

দুই বছর আগে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর এই প্রতিবেদক নিজে মিরপুরের জনতা হাউজিংয়ে মৌসুমী ও মেঘলার বাসায় গিয়ে তথ্যানুসন্ধানের চেষ্টা করেন। কিন্তু মৌসুমীর বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে, তারা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। তবে বাসার নিরাপত্তারক্ষী আব্দুল বারেক ওই সময় জানিয়েছিলেন, বাবা-মা ও দুই ভাইয়ের সঙ্গে বসবাসরত মৌসুমীল বাবা হাবিবুর রহমান একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা। মৌসুমী মুখ ঢাকা নেকাব পরে চলাফেরা করতে দেখেছেন। মাঝে মধ্যেই তার কাছে একইভাবে নেকাব পড়া মেয়েরা আসতো। গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর ফ্ল্যাট মালিক সমিতির পক্ষ থেকে মৌসুমীর নেকাব পড়া অতিথি আসার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। মৌসুমীর মতো একইভাবে চলাফেরা করতো খাদিজা পারভীন মেঘলা।

র‌্যাবের সেই সময়ের তদন্ত কর্মকর্তা শামসুল ইসলাম বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে মৌসুমী ও মেঘলা তাদের বাসায় সহযোগী জঙ্গিদের নিয়ে শলা-পরামর্শ করার কথা স্বীকার করেছেন। তবে আদালতে গিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হননি তারা দুজনই।’

পুরনো নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, মৌসুমী ওরফে মৌ মিরপুরের ইসলামীয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে এসএসসি পাস করে। এরপর ২০১২ সালে মিরপুর চিড়িয়াখানা রোডের বিসিআইসি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে। এরপর মেডিক্যাল ও ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার জন্য ফার্মগেটের ইউসিসি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়। ২০১৩ সালে সে মানারাত ইউনিভার্সিটিতে ফার্মেসি বিভাগে অনার্স ১ম বর্ষে ভর্তি হয়। গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যাওয়ার পর মানারাত কর্তৃপক্ষ তাকে বহিষ্কার করে।

এদিকে, জনতা হাউজিংয়েরই একটি বাড়ির পঞ্চমতলায় এক পরিবারের সঙ্গে সাবলেট থাকা খাদিজা পারভীন মেঘলা ২০১৩ সালে জিপিএ ৪ দশমিক ৭০ পেয়ে এইচএসসি পাস করে। ওই বছরই রোকনুজ্জামান নামে এক যুবকের সঙ্গে তার পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। সেও খাদিজার সঙ্গে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল।

পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেছেন, ‘আত্মসমর্পণ করা দুই নারী জঙ্গি আগে থেকেই জঙ্গিবাদে জড়িত। এ অভিযোগে ২০১৬ সালে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর ৭/৮ মাস জেল খেটে জামিনে বের হয়ে আবারও জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে। জেল থেকে বের হওয়ার পর তারা কেউ নিজেদের বাসায় ফিরে যায়নি। গ্রেফতার হওয়া এক নারীর স্বামী নব্য জেএমবির শীর্ষ পর্যায়ের নেতা বলে আমরা জানতে পেরেছি। আরেকজনের এখনও বিয়ে হয়নি। তবে বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল।’ তিনি বলেন, ‘নরসিংদীর এই দু’টি আস্তানায় আরও অনেকের যাতায়াত ছিল। গ্রেফতার হওয়া দুই নারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের পরিকল্পনার বিষয়ে জানার চেষ্টা করা হবে। আমরা তাদের নিষ্ক্রিয় করেছি, এ বিষয়ে আতঙ্কের কোনও কারণ নেই।’
সূত্র: বাংলাট্রিবিউন,নুরুজ্জামান লাবু ও নরসিংদী থেকে আসাদুজ্জামান রিপন ২১:১৩ , অক্টোবর ১৭ , ২০১৮।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *