| ১৯শে মার্চ, ২০১৯ ইং | ৫ই চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১১ই রজব, ১৪৪০ হিজরী | মঙ্গলবার

বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

নিজস্ব প্রতিবেদক | নরসিংদী প্রতিদিন-
রবিবার, ১৭ মার্চ ২০১৯:
বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রোববার সকাল ৭টায় ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু প্রতিকৃতিতে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এবং পরে আওয়ামী লীগ সভাপতি হিসেবে তিনি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৯তম জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে তিনি এ শ্রদ্ধা জানান।

শ্রদ্ধা নিবেদনের পর প্রধানমন্ত্রী কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে প্রধানমন্ত্রী চলে গেলে সকলের জন্য জায়গাটি উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। এরপর অওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন, ভাতৃপ্রতীম সংগঠন ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক সংস্কৃতিক সংগঠন বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানায়। এ সময় স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মদিন আজ। ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষের বঙ্গ প্রদেশের এক অখ্যাত জনপদ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্মগ্রহণ করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। এ দিনটি জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে। শত বছরের শোষণ-নিপীড়ন থেকে জাতিকে মুক্তির দিশা দেখানো এ কীর্তিমান বাঙালি জন্ম নিয়েছিলেন বলেই জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্র; যার ইতিহাসের পরতে পরতে রয়েছে লড়াই ও সংগ্রামের কীর্তিগাথা। আর সব কীর্তিগাথাকে ছাড়িয়ে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিলেন ইতিহাসের মহানায়ক।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালির ভাষা-সংস্কৃতি, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মুক্তির লড়াইয়ে ঐতিহাসিক নেতৃত্বের স্বাক্ষর রচনাকারী শেখ মুজিব হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু। আর তার নেতৃত্বেই ১৯৭১ সালে বাঙালি পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধিকার আদায়ের চূড়ান্ত লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিল। ছিনিয়ে এনেছিল জাতীয় মুক্তি। পেয়েছিল জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির এক পত্রিকা লিখেছিল, ‘শেখ মুজিবকে চতুর্দশ লুইয়ের সঙ্গে তুলনা করা যায়। জনগণ তার কাছে এত প্রিয় ছিল, লুইয়ের মতো তিনি এ দাবি করতে পারেন আমিই রাষ্ট্র।’

বাঙালির মুক্তির ইশতেহার, ১৯৭১-এর ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর স্বাধীনতার জন্য বাঙালি মরণপণ লড়াইয়ে নেমেছিল। শুধু বাঙালি নয়, সারা বিশ্বের শোষিত-নিপীড়িত মানুষের জন্য সেদিনের সে ভাষণ এখনো প্রেরণাদায়ক। ওই ভাষণের পর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জনপ্রিয় সাপ্তাহিক নিউজ উইক বঙ্গবন্ধুকে আখ্যা দিয়েছিল ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’ বা ‘রাজনীতির কবি’ নামে। গত বছর ইউনেস্কোর ‘ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টার’-এ অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে ৭ মার্চের সে ভাষণ।

কবি শামুসর রাহমান বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ করে লিখেছিলেন অমর পঙ্ক্তি- ‘ধন্য সেই পুরুষ যাঁর নামের উপর পাখা মেলে দেয় জ্যোৎস্নার সারস,/ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের উপর পতাকার মতো/দুলতে থাকে স্বাধীনতা/ধন্য সেই পুরুষ যাঁর নামের ওপর ঝরে মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ধ্বনি।’

ফরিদপুরের মহকুমা গোপালগঞ্জের এক সেরেস্তাদার শেখ লুৎফর রহমান ও সায়েরা খাতুন দম্পতির কোল আলো করে যে শিশুটি ১৯২০ সালে জন্ম নিয়েছিল, সেই শিশুটিই তার পূর্বাপর সব কালের সব কীর্তিমান বাঙালিকে ছাড়িয়ে এমন ধ্রুপদি বিশ্বনেতৃত্ব হয়ে উঠবে-এমনটি হয়তো ভাবেনি কেউ। কিন্তু শেখ মুজিব তার জীবনের শুরু থেকেই ঠিক করে নিয়েছিলেন তার গন্তব্য কোথায়। ফলে তার স্কন্ধেই উঠেছিল জাতীয় মুক্তির ভার। ফলে তারই সময়ে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানীর মতো কিংবদন্তিদের ছাড়িয়ে তিনিই হয়ে উঠেছেন মুক্তির দূত।

সেই ১৯৩৯ সালে মিশনারি স্কুলে পড়ার সময় স্কুলের ছাদ সংস্কারের দাবি তুলে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর। সেই থেকে মানুষের মুক্তির পক্ষে আমৃত্যু দাঁড়িয়ে ছিলেন ইতিহাসের জ্বালামুখে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪০ সালে সর্বভারতীয় মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগদানের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ (বর্তমানে মওলানা আজাদ কলেজ) ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগের পূর্ব পাকিস্তান শাখার যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সালে তিনি পার্টির সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের টিকিটে ইস্ট বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হন। ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আজীবন সোচ্চার এই অবিসংবাদিত নেতাকে রাজনৈতিক জীবনে বহুবার কারাবরণ করতে হয়। তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬-দফা ও পরবর্তীতে ১১ দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধিকার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং বঙ্গবন্ধু উপাধি লাভ করেন।

তার সাহসী ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বাঙালি জাতি ধাপে ধাপে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে থাকে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জিত হলেও তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর না করে বাঙালি জাতির ওপর নানা নির্যাতন শুরু করে। বঙ্গবন্ধু একাত্তরের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেন।

অন্যদিকে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং তার নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালির বহু আকাঙ্ক্ষিত বিজয় ও স্বাধীনতা অর্জিত হয়।

বিংশ শতাব্দীতে নির্যাতিত, নিপীড়িত ও শোষিত মানুষের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করে যারা বিশ্বনন্দিত নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের অন্যতম। সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বিরামহীন সংগ্রামে অবদান রাখার জন্য তিনি বিশ্বশান্তি পরিষদের জুলিও কুরি পদকে ভূষিত হন।

বিবিসির এক জরিপে তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হন। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু যখন বিভিন্নমুখী কার্যক্রম গ্রহণ করতে শুরু করেন ঠিক সেই মুহূর্তে স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজিত শক্তি ও কায়েমী স্বার্থান্বেষী মহল তার বিরুদ্ধে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র শুরু করে এবং ওই ষড়যন্ত্রেরই অংশ হিসেবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি তার ধানমন্ডির বাসভবনে কতিপয় বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার হাতে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নিহত হন।

জাতীয় শিশু দিবসের কর্মসূচি
জাতি যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে আজ বঙ্গবন্ধুর জন্ম দিবস উদযাপন করছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোয় দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় উদযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। দিনটিতে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য : ‘বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন, শিশুর জীবন করো রঙিন’। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে ২০২১ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত সময়কে মুজিব বর্ষ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ উপলক্ষে বছরব্যাপী জাতীয়ভাবে নানা কর্মসূচি পালন করা হবে।

আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু ভবন ও দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন। সকাল ৭টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে রক্ষিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ। এছাড়া দিবসটি উপলক্ষে আগামীকাল আলোচনা সভার আয়োজন করেছে আওয়ামী লীগ। এদিন বিকাল ৩টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিতব্য আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করবেন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়ায় প্রতিবারের মতো এবারও বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামীকাল সকাল দশটায় টুঙ্গিপাড়ায় চিরনিদ্রায় শায়িত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করবেন। পরে তারা ফাতেহা পাঠ ও মোনাজাতে অংশ নেবেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১২টা ১০ মিনিট পর্যন্ত টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ কমপ্লেক্সে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকী এবং জাতীয় শিশু দিবস-২০১৯ উদযাপন উপলক্ষে গোপালগঞ্জ জেলা ব্রান্ডিংয়ের লোগোর রেপ্লিকা উপহার হিসেবে গ্রহণ করবেন।

এছাড়া ‘বঙ্গবন্ধুকে লেখা চিঠি’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন, বঙ্গবন্ধুকে লেখা শ্রেষ্ঠ চিঠি পাঠ, সেলাই মেশিন বিতরণ, ‘আমার কথা শোন’-শীর্ষক ভিডিও প্রদর্শন, জাতীয় শিশু দিবসের আলোচনা সভায় যোগদান ও প্রধান অতিথির ভাষণ প্রদান করবেন প্রধানমন্ত্রী।

সময় বাচাঁতে ঘরে বসে কেনা-কাটা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *