| ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২০শে মুহাররম, ১৪৪১ হিজরী | শুক্রবার

এক সময়কার কিংবদন্তী ফুটবলার পলাশের ফখরুজ্জামান দোলন

সাব্বির হোসেন | নরসিংদী প্রতিদিন –
মঙ্গলবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ :
দেশের এক সময়কার কিংবদন্তী ফুটবলার পলাশের ফখরুজ্জামান দোলন। তিনি নরসিংদীর পলাশ উপজেলার চরসিন্ধুর গ্রামের এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। কৈশোরের চমক দোলন স্কুল জীবনে থাকাকালীন সময়ে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং ফুটবলে সব সময় ১ম স্থান অধিকারী হতো। যেখানেই দৌড় প্রতিযোগিতা যেতো সেখানেই প্রথম স্থান আর ফুটবল মাঠে সিনিয়র জুনিয়র কোন খেলোয়াড়ই তার পা থেকে সহজেই বল কেড়ে নিতে পারতনা। বিস্ময়কর যাদু ছিলো তার পায়ে। তার সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে দেশের ফুটবলপ্রেমী ও ক্রীড়ামোদীরা জানান, কিংবদন্তি ফুটবলার দোলন আমাদের দেশের সম্পদ। সে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকুক অনন্তকাল। 
জানা যায়, দোলন যখন ষষ্ঠ শ্রেনীতে পড়ে তখন ১৯৭৪ সাল। তৎকালীন গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ থানার আন্তর্জাতিক বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ২৫০টি স্কুলের মধ্যে চ্যালেঞ্জ করে ১০০ মিটার, ২০০মিটার,দৌড় প্রতিযোগিতা ও দীর্ঘলাফে প্রথম স্থান অধিকার করে ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত চরসিন্দুর স্কুলের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনেন তিনি। স্কুলের শিক্ষক মহোদয়, এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও ফুটবল পন্ডিতরা জরিপ করে মনে করেছিল স্কুলে পড়ুয়া এই বয়সে পৃথিবীর কোন দেশ, কোন ব্যক্তি দৌড়ে এবং ফুটবলে তাকে পিছনে ফেলতে পারবেনা। দোলনের বাড়িতে বৃটিশ আমল থেকেই ফুটবল খেলার মাঠ ছিল। এই মাঠের এক পাশে বসে প্রতিদিন তার বাবা চাচা ফুটবল খেলা উপভোগ করতেন। তার জন্য উন্নতমানের খাবারের ব্যবস্থা করতেন। সোনার চামচ মুখে দিয়েই খাওয়াতেন। উৎসব আদর সোহাগ দিয়ে তার মন ভরে দিতেন। স্কুলের শিক্ষক মহোদয় সবাই দোলনকে অনেক আদর করতেন। সেই সাথে কড়া নজর রাখতেন। স্কুলের শিক্ষক সাবেক ফুটবলার যারা ছিল তারা সবাই দোলনের বাবা চাচার সাথে উচ্চ স্বরে তার এই বিরল প্রতিভা ও বিভিন্ন দিক দিয়ে আলাপ করতেন। দোলনের বাবা চাচার সাথে আলাপ করে ওয়াদা করলেন যদি বেঁচে থাকি এসএসসি পাশ করার পর দোলনকে ইউরোপ ফুটবলের সবচেয়ে দামি ক্লাবে পাঠাবে উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য। যত টাকাই ব্যয় হোক ছেলের পিছনে খরচ করবো। কিন্তু ভাগ্যোর নির্মম পরিহাস ৯ম শ্রেনীতে পড়ার সময়েই দোলনের বাবা হঠাৎ মারা গেলেন। তার ৬ মাস পর তার চাচা ও মারা গেলেন। আর এই সময়েই ঢাকা আবাহনী মাঠে সারা বাংলাদেশের ক্ষুদে ফটবলারদের বাছাই পর্ব চলছিল। সেখানে হাজার হাজার ক্ষুদে ফুটবলারদের মধ্যে দোলন অংশগ্রহণ করে প্রথম স্থান অধিকার করে। দূরপাল্লার রানিং শটে ৩টি গোল করাসহ মাঠে অসাধারণ ফুটবল খেলা দেখানোর পর আবাহনীর দর্শকরা তাকে দেখার জন্য উপচে পড়া ভিড় জমিয়ে ছিল। ঐ সময়টায় তার কোন প্রশিক্ষক ছিলনা, এমনকি প্রশিক্ষণ ও ছিলনা।
আবাহনী যুব ফুটবলের বাছাই এর পর একটা ফাইনাল খেলায় আমন্ত্রিত হয়ে যাবার পর দূরপাল্লার তীব্র রানিং শটে গোল করার সময় বে-কায়দায় শট মারার পর তার ডান পায়ে কুচকি আলাদা হয়ে যায়। তিনবারই একই জায়গায় আঘাত পাওয়ায় জীবনের জন্য তার আশা আকাঙ্ক্ষা ধূলিসাৎ হয়ে যায়। তার বাবার আশা ও পূরণ হলো না। স্কুল জীবন পার হয়ে গ্রামে-গঞ্জে ও ঢাকাতে বেশ কয়েক বার ক্লাবে খেলেছে এই ইনজুরি নিয়েই। পূর্ণ শক্তি মাঠে প্রয়োগ করতে পারে নাই।
ঢাকা মনসুর স্পোটিং ক্লাবের সিনিয়র দলের হয়ে ১২টি জেলাতে অংশগ্রহণ করেছেন তিনি। ফুটবল দোলনকে সবসময় কাঁদায়। শেষ পর্যন্ত ফুটবলে সুবিধা করতে না পারায় অন্য পথ বেছে নিয়েছিল দোলন।
ষষ্ঠ শ্রেনীতে পড়ার সময় ফুটবল খেলার সাথে সাথে দোলন বল কন্ট্রোলিং করত চমৎকার ভঙ্গিতে। দোলন মাথায় ফুটবল রেখে অসাধ্য কাজ সাধন করতে পারে। মাথায় ফুটবল বসাইয়া রেখে চলন্ত মোটর সাইকেলের উপর বসে ২ হাত ছেড়ে ঘন্টায় ৪০ মাইল গতিতে মোটর সাইকেল চালানো অবস্থায় লেখা পড়া, খাওয়া দাওয়া, ব্যায়াম করা, জামা খোলা,একাধিক বল ঘোরানোসহ আরও অনেক কিছুই করতে পারে। মাথায় ফুটবল রেখে তালগাছ থেকে তালপাড়া, সুপারি পাড়া, ডাব পাড়া, সাঁতার কাটা, দৌড়ানোসহ ৬টা বল নিয়ে বহু ফুটবল ক্রীড়া নৈপূণ্য দেখাতে পারে।
বিটিভি, বিটিভি ওয়াল্ডে বহু ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এসব ফুটবল কারিশমা সারাবিশ্বে প্রচার হয়েছে বহুবার।বেসরকারী টেলিভিশন এটিএন বাংলা সহ প্রায় সব টিভি চ্যানেলে প্রচার হয়ে সে পেয়েছে বিশ্বখ্যাতির মর্যাদা।বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর একমাত্র দোলনই বিদেশের মাটিতে আন্তর্জাতিক ফুটবল আসরে ডাক পায়। কাতার ফুটবল এসোসিয়েশান ২০০৪ সালে ১ মাসের জন্য বিমানে আসা যাবার টিকিটে পাঠিয়ে তাকে কাতার নিয়ে যাওয়া হয়।যাহা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ আল জাজিরা টেলিভিশনে প্রচার করে সারা বিশ্ববাসীর কাছে দোলনকে তুলে ধরে।
ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে এ দোলনই সর্বপ্রথম দর্শকদের ফুটবল নৈপূণ্য দেখায়। ১৯৯৬ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবলে কারিশমা দেখিয়ে চমক সৃষ্টি করে। ১৯৮২ সালে আগাখান গোল্ডকাপ ফুটবল ও ২০০০ সালে প্রথম লিটল টাটা জাতীয় লীগে ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে ফুটবল নৈপূণ্য দেখিয়ে লক্ষ কোটি মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। দেশ স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন আয়োজিত যত গুলি আন্তর্জাতিক ফুটবল আসর বসেছে সবগুলি আসরেই দোলন আমন্ত্রিত হয়ে খেলা দেখিয়ে চমক সৃষ্টি করে। সর্বপ্রথম দোলনই একমাত্র ঢাকা স্টেডিয়ামসহ দেশের সবগুলি স্টেডিয়ামে আমন্ত্রণ পায়। সর্বপ্রথম তিনিই ফুটবলের উপর গবেষণা চালিয়ে বহু কিছু আবিস্কার করেন। ফুটবল কন্ট্রোলিংয়ে দোলনের অনেক ধরনের ক্ষমতা রয়েছে। হাত এবং মাটিতে বল স্পর্শ না করে শরীরের কোন অঙ্গে বল না বসিয়ে বিরতিহীনভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা বল উপরে রেখে দিতে পারে। মাথায় বল বসাইয়া অসংখ্য ফুটবল কারিশমা দেখাতে পারে। 

সময় বাচাঁতে ঘরে বসে কেনা-কাটা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *