বৃহস্পতিবার | ৬ই আগস্ট, ২০২০ ইং |

এন্ড্রু কিশোরকে হারিয়ে কাঁদছে বাংলাদেশ

সফুরউদ্দিন প্রভাত | নরসিংদী প্রতিদিন-
মঙ্গলবার,৭ জুলাই ২০২০:
স্বাধীনতার পর এই দেশের সঙ্গীতে বিরাট এক প্রাপ্তির নাম এন্ড্রু কিশোর। বিশেষ করে এদেশের চলচ্চিত্রে এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠ যেন রাজতিলক৷

বহু গান তিনি উপহার দিয়েছেন। মুগ্ধ করে রেখেছিলেন কয়েক প্রজন্ম। সেই প্রিয় শিল্পী আজ হারিয়ে গেলেন। চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তার প্রস্থান শোকের সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছে সংগীতের অনুরাগীদের। দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ নানা বয়স-পেশার মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শোক প্রকাশ করছেন।

‘ভেঙেছে পিঞ্জর/মেলেছে ডানা… উড়েছে পাখি/পথ অচেনা…’ অসামান্য ভরাট কণ্ঠে চার দশকের বেশি সময়জুড়ে বাংলাদেশের মানুষের মন জয় করা কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোর সত্যিই জীবনের পিঞ্জর ছিন্ন করে অনন্তের পথে পাড়ি দিয়েছেন। ‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প’, ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’, ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’, ‘আমার বুকের মধ্যে খানে’, ‘আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন শুনেছিলাম গান’, ‘পড়ে না চোখের পলক’সহ প্রায় ৫ হাজারের বেশি গানের জননন্দিত শিল্পী এন্ড্রু কিশোর দীর্ঘদিন মরণব্যাধি ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে গতকাল সন্ধ্যায় পাড়ি দেন না ফেরার দেশে। রাজশাহী মহানগরীর মহিষবাথান এলাকায় তার বোন ডা. শিখা বিশ্বাস ও বোনজামাই চিকিৎসক ডা. প্যাট্রিক বিপুল বিশ্বাসের বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন অগণিত শ্রোতার প্রিয় এই শিল্পী। তার চলে যাওয়ার সংবাদে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। নন্দিত এই শিল্পীর শূন্যতা কখনও পূরণ হবে না বলে মনে করেন দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের গুণী ব্যক্তি এবং সংগীতপ্রেমী অগণিত মানুষ। তার বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। তিনি স্ত্রী ইতি কিশোর, পুত্র সপ্তক ও কন্যা সংজ্ঞাকে রেখে গেছেন।

এন্ড্রু কিশোরের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি শিল্পীর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

প্রধানমন্ত্রী তার শোকবার্তায় শিল্পীর আত্মার শান্তি কামনা করে বলেছেন, এন্ড্রু কিশোর তার গানের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

সংসদ সদস্য আলহাজ নজরুল ইসলাম বাবু বলেন, পৃথিবীতে যারা এসেছে সবাই একদিন চলে যাবে। এই সত্যটা আমাদের মানতে হয়। কিন্তু এই একজন মানুষ, যে চলে গেল সত্যিকার অর্থেই অনেক ক্ষতি হয়ে গেল। কারণ আমাদের দেশের গণমানুষের জন্য সঙ্গীতের যে চর্চাটা ছিল সেটা তার হাত দিয়ে শুরু হয়েছিল। তার যা কণ্ঠ, তার যে ত্যাগ-তিতীক্ষা, সংগীতের সেটি কারো সঙ্গে তুলনা চলে না আমি মনে করি। তাই তার বিদায়ে আমাদের অতুলনীয় ও অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল।

গত বছর ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার এন্ড্রু কিশোর টানা ৯ মাস সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন থেকে গত ১১ জুন একটি বিশেষ ফ্লাইটে দেশে ফেরেন। তারপর থেকে রাজশাহীর মহিষবাথান এলকায় বোন ডা. শিখা বিশ্বাসের বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন প্লেব্যাক সম্রাটখ্যাত এই শিল্পী। তার চিকিৎসার দেখভাল করছিলেন বোনজামাই ডা. প্যাট্রিক বিপুল বিশ্বাস। তিনি জানান, রাজশাহীতে আসায় কিছুটা সুস্থ মনে হলেও ক্রমে তার শরীরের অবনতি ঘটতে থাকে। যে কারণে অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছিল তাকে। কিন্তু সবরকম চেষ্টার পরও তাকে আর আমাদের মাঝে ধরে রাখা যায়নি। তিনি আরও জানান, এন্ড্রু কিশোরের এক ছেলে ও এক মেয়ে। তারা দু’জনেই অস্ট্রেলিয়ায় আছে। বাবার শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ার খবর শুনে দু’জনই দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। টিকিট পাওয়ামাত্রই তারা দেশে ফিরবেন। তার আগে এন্ড্রু কিশোরের মরদেহ রাজশাহী মেডিকেল কলেজের হিমঘরে রাখা হবে। এন্ড্রু কিশোরের পুত্র ও কন্যা দেশে ফেরার পর রাজশাহী সার্কিট হাউসের পাশের খ্রিষ্টান কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হবে বলেও তিনি জানান।

শরীরে নানা ধরনের জটিলতা নিয়ে এন্ড্রু কিশোর গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে দেশ ছাড়েন। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার শরীরে নন-হজকিন লিম্ম্ফোমা নামের ব্ল্যাড ক্যান্সার ধরা পড়ে। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক লিম সুন থাইয়ের অধীনে চলে তার চিকিৎসা। টানা নয় মাস সেখানেই তার চিকিৎসা চলে। কিংবদন্তি এই শিল্পীর চিকিৎসায় সহায়তার হাত বাড়ান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ব্যয়বহুল এই চিকিৎসার খরচ জোগাতে বিক্রি করে দেন রাজশাহী শহরে কেনা ফ্ল্যাটটি। শিল্পীর পরিবারের পাশাপাশি সংগীতশিল্পী, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান এবং প্রবাসীরা এগিয়ে এসেছেন। গেল ফেব্রুয়ারিতে সিঙ্গাপুর বিজনেস সোসাইটি এবং বাংলাদেশ চেম্ব্বারের আয়োজনে সিঙ্গাপুরের স্থানীয় গেটওয়ে থিয়েটার হলে আয়োজন করা হয় ‘এন্ড্রু কিশোরের জন্য ভালোবাসা’ শিরোনামের সংগীতানুষ্ঠান। এতে দেশের তারকা শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেন।

এন্ড্রু কিশোর বাংলাদেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্র্রিতে অবিস্মরণীয় নাম। চলচ্চিত্রে সবচেয়ে বেশি গানে কণ্ঠ দিয়ে তিনি হয়েছেন প্লেব্যাক সম্রাট। ১৯৫৫ সালের ৮ নভেম্বর রাজশাহী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। এন্ড্রু কিশোরের মায়ের প্রিয় শিল্পী ছিলেন কিশোর কুমার। তার নামের সঙ্গে মিলিয়ে ছেলের নাম রাখেন এন্ড্রু কিশোর। তিনি স্বপ্ন দেখতেন ছেলে একদিন শিল্পী হবে। দেশের মানুষ তাকে জানবে, চিনবে। এন্ড্রু কিশোরের গানের হাতেখড়ি হয় ওস্তাদ আবদুল আজিজ বাচ্চুর কাছে।

এন্ড্রু কিশোর প্লেব্যাক শুরু করেন ১৯৭৭ সালে। সুরকার আলম খানের সুরে ‘মেইল ট্রেন’ ছবির মধ্য দিয়ে তার শুরু। ছবিতে মুক্তি পাওয়া প্রথম গান ‘এক চোর যায় চলে’। এটি ১৯৭৯ সালে ‘প্রতিজ্ঞা’ ছবিতে ব্যবহার করা হয়েছিল। এ গানটি প্রকাশের পর আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আনোয়ার হোসেন, রাজ্জাক, প্রবীর মিত্র থেকে শুরু করে বর্তমান শীর্ষ নায়ক শাকিব খান পর্যন্ত এন্ড্রু কিশোরের প্লেব্যাক ইতিহাসের খেরোখাতা। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় সব নায়কের লিপে তার গান আছে।

গানের জন্য এ পর্যন্ত পুরুষ কণ্ঠশিল্পী হিসেবে সর্বাধিক আটবার পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। ১৯৮২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘বড় ভালো লোক ছিল’ ছবির ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুশ’ গানটির জন্য প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান এন্ড্রু কিশোর। এরপর সবাই তো ভালোবাসা চায় [সারেন্ডার, ১৯৮৭], আমি পথ চলি একা [ক্ষতিপূরণ, ১৯৮৯], দুঃখ বিনা হয় না সাধনা [পদ্মা মেঘনা যমুনা, ১৯৯১], এসো একবার দুজনে আবার [কবুল, ১৯৯৬], চোখ যে মনের কথা বলে [আজ গায়ে হলুদ, ২০০০], সাজঘর [২০০৭] এবং কি যাদু করিলা [২০০৮] গান গেয়ে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। এর বাইরেও অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তিনি। সবচেয়ে বড় যে পুরস্কার এন্ড্রু কিশোর জীবদ্দশায় পেয়েছেন, তা হচ্ছে- কয়েক প্রজন্মের বাঙালি শ্রোতার অকৃত্রিম ভালোবাসা। আগামী বহু প্রজন্ম এন্ড্রু কিশোরের বাংলা গানে উদ্বেলিত হবেন, এ কথা নির্দি্বধায় বলা যায়।

follow and like us:
0