| ৭ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং | ২৩শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ৮ই রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী | শনিবার

প্রকাশিত ডেস্ক*
নরসিংদী প্রতিদিন,সোমবার,২ এপ্রিল ২০১৮:
নরসিংদী-২ আসনটি বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু নবম সংসদ নির্বাচনে আসনটি তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়।

আওয়ামী লীগের ডা. আনোয়ারুল আশরাফ খান দিলীপের কাছে হেরে যান বিএনপি নেতা ড. আবদুল মঈন খান। দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। সে কারণে পলাশের চারটি ইউনিয়ন ও সদর উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই নির্বাচনী এলাকাটির রাজনৈতিক শক্তি ভারসাম্য এখন আওয়ামী লীগের দিকে হেলে আছে।
এই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য কামরুল আশরাফ খান পোটন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আশরাফ খানের ছোট ভাই। আগামী নির্বাচনে কামরুল আশরাফ বড় ভাইকে সমর্থন দিয়ে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে এই আসনে আনোয়ারুল আশরাফ আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী বলে দলের নেতাকর্মীরা জানায়।

এই আসনে বর্তমানে সংসদ সদস্য পরিবারের একক আধিপত্যে কোণঠাসা বিএনপি। গত পাঁচ বছরে বিএনপি স্থানীয়ভাবে দলীয় কোনো কর্মসূচি পর্যন্ত পালন করতে পারেনি।

তবে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান একক প্রার্থী বলে জানায় নেতাকর্মীরা।
এ ছাড়া গত নির্বাচনে পরাজিত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের প্রার্থী জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ-ইনু) জায়েদুল কবির একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। তিনি জাসদের টিকিটে প্রার্থী হতে চান। জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আজম খানও এই আসন থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী বলে জানায় দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

আওয়ামী লীগ : ২০০৩ সালে আনোয়ারুল আশরাফ খানকে পলাশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও শেখ মো. ইলিয়াসকে সাধারণ সম্পাদক করে ৬৫ সদস্যের কমিটি করা হয়। গত ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য হন আনোয়ারুল আশরাফ। এর আগে এই আসনটি সব সময়ই ছিল বিএনপির দখলে। গত ১০ বছরে আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যান সাবেক এই সংসদ সদস্য। যুবলীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের সব সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন নিয়ে আসেন নিজের কবজায়। ২০১১ সালের পৌরসভা নির্বাচনে নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে শ্যালক শরীফুল হককে ঘোড়াশাল পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত করেন। এতে দলের নেতৃস্থানীয় কয়েকজন নেতাকর্মী অসন্তুষ্ট হলেও সেটা প্রকাশ করতে পারেনি বলে আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে।

পরিকল্পনামাফিক সংসদীয় এলাকায় অনেক উন্নয়ন করে আনোয়ারুল আশরাফ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন ব্যাপকভাবে। প্রতীক বরাদ্দের আগের দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন জোটের মনোনীত প্রার্থী। শেষ সময়ে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে শরিক দল জাসদের নরসিংদী জেলা শাখার সভাপতি জায়েদুল কবিরকে আসনটি ছেড়ে দেওয়া হয়। আনোয়ারুল আশরাফ কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিলেও ভালোভাবে নিতে পারেননি।

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, তৃণমূলে দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে আপন ছোট ভাই কামরুল আশরাফ খান পোটনকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেন আনোয়ারুল আশরাফ। এমনকি দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে তিনিসহ পলাশ উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুল আশরাফের হয়ে কাজ করে। এতে ভোটে ভরাডুবি হয় জোট প্রার্থী জায়েদুল কবিরের। জয়লাভ করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী।

কামরুল আশরাফ খান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর উপজেলায় আওয়ামী লীগের একক আধিপত্য বিস্তারে নানা কর্মসূচি নেন। এর মধ্যে নিজেদের আস্থাভাজন সৈয়দ জাবেদ হোসেনকে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী করে জিতিয়ে আনেন। আর শরীফুল হককে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবার পৌরসভার মেয়র পদে বসান। পাশাপাশি সংসদীয় আসনের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে জিতিয়ে আনেন নিজেদের আস্থাভাজনদের। এ ছাড়া যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ সব সংগঠনকে ঢেলে সাজিয়ে নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন সংসদ সদস্য।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বর্তমান সংসদ সদস্য বড় ভাই আনোয়ারুল আশরাফ খানকে আবার সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করতে সব প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

পলাশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কবির মৃধা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের আসনে আগামী নির্বাচনে আনোয়ারুল আশরাফ খান দিলীপ আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী। তাঁর কোনো বিকল্প নেই। আর সে জন্যই আমরা যত দূর জানি বর্তমান এমপি মহোদয় তাঁরই বড় ভাই সাবেক এমপিকে আসনটি ছেড়ে দেবেন। আমরা সেভাবেই কাজ করছি। ’

পলাশ উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আল মুজাহিদ হোসেন তুষার বলেন, ‘জাসদের কোনো সাংগঠনিক অবস্থান আমাদের এই অঞ্চলে নেই। তাই এবার আশা করছি, জননেত্রী শেখ হাসিনা এই আসনটি আওয়ামী লীগের মধ্যেই রাখবেন। তা না হলে দেশনেত্রী আমাদের সংসদ সদস্যদের দিয়ে গত ১০ বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন করাতেন না। ’

পলাশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আশরাফ বলেন, ‘আজ থেকে ১০-১২ বছর আগে পলাশে আওয়ামী লীগের অবস্থান ছিল তৃতীয়। সেই অবস্থা থেকে আজ আমরা প্রথম অবস্থানে রয়েছি। বিএনপিকে আসলে আমরা কোনো কাজে বাধা দিই না। কিন্তু তারা কোনো কিছু করার মতো সাংগঠনিক অবস্থানে নেই। এবার পোটন (বর্তমান সংসদ সদস্য) নির্বাচনে অংশ নেবে না। গতবারও আমি আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী ছিলাম। পরে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে সরে আসতে বাধ্য হই। এবারও আমি আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী। ’

জাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা শাখার সভাপতি জায়েদুল কবির বলেন, ‘জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে ১৪ দলীয় ঐক্য বজায় রাখতে হবে। এরই ধারাবাহিকতায় স্থানীয় পরিবারকেন্দ্রিক অপরাজনীতির দিকে খেয়াল রেখে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায় যা সিদ্ধান্ত নেবে, আমরা সেভাবেই কাজ করব। ’

বিএনপি : ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে এক-এগারো (২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতাগ্রহণ) আগ পর্যন্ত নরসিংদী-২ আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন বিএনপির প্রভাবশালী নেতা আবদুল মঈন খান। নরসিংদী জেলা গঠনের আগে (নারায়ণগঞ্জ মহকুমা) দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন নিয়ে তাঁর বাবা আবদুল মোমেন খান সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। হয়েছিলেন খাদ্যমন্ত্রীও। পরবর্তী সময়ে ছেলে মঈন খানও টানা চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কয়েকবার মন্ত্রীও হয়েছেন তিনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি পরাজিত হওয়ার পর বিএনপির প্রভাব কমতে শুরু করে।

দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলছে, আওয়ামী লীগের হামলা ও মামলার মুখে বিএনপির নেতাকর্মীরা দলীয় কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারছে না। এতে অনেকটা সাংগঠনিক ছন্দ হারিয়ে ফেলে বর্তমানে সংসদের বাইরে থাকা দলটি।

পলাশ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পলাশ হচ্ছে বিএনপির ভোট ব্যাংক। ড. আবদুল মঈন খানের নেতৃত্বে আমাদের সাংগঠনিক অবস্থা অনেক ভালো; কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাবাপন্ন শাসন আমলে পলাশে আমরা কোনো ধরনের সভা-সমাবেশ করতে পারি না। হামলা-মামলা ও নির্যাতন করে দাবিয়ে রাখা হচ্ছে আমাদের নেতা-কর্মীদের। দেশে যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয় তাহলে পলাশে বিএনপির জয় সুনিশ্চিত। মঈন খান এ আসনে বিএনপির একমাত্র প্রার্থী। এই আসনে তাঁর বিকল্প কোনো প্রার্থী নেই বললেই চলে।

মঈন খানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করে এবং খুদে বার্তা পাঠিয়েও এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সূত্র: কালের কণ্ঠ,মনিরুজ্জামান, নরসিংদী ২ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০

সময় বাচাঁতে ঘরে বসে কেনা-কাটা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *